দেশের মোট বিদেশি ঋণের ৭৮ শতাংশ নিয়েছে আ.লীগ সরকার

 

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে দেশের বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৮ হাজার ৬২ কোটি ডলার। এসব ঋণের বড় অংশই ছিল উচ্চ সুদ ও কঠোর শর্তসাপেক্ষ। ফলে এখন বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৪০০ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৭৮ শতাংশই নেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় ডলারের বিনিময় হার ছিল প্রায় ৬৯ টাকা। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতা ছাড়ার সময় তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২০ টাকায়, যদিও ব্যাংকভেদে ১৩২ টাকা পর্যন্ত দরেও ডলার বিক্রি হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে বৈদেশিক ঋণের সুদের হারও। ২০০৯ সালে যেখানে সুদের হার ছিল ৪ থেকে ৫ শতাংশ, বর্তমানে তা বেড়ে ৭ থেকে ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক মন্দার সময় এই হার আরও বেড়েছিল।

 

 

চুক্তি অনুযায়ী, মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশ বাজারভিত্তিক সুদ ও বিনিময় হারের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ ঋণ পরিশোধের সময় ডলারের বাজারদর ও সুদের হার অনুযায়ী অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। গত সাড়ে ১৫ বছরে ডলারের দাম ৫১ টাকা বাড়ায় টাকার মানও একই অনুপাতে কমেছে। পাশাপাশি ঋণের মেয়াদ বাড়ানোয় অতিরিক্ত সুদ ও সার্ভিস চার্জও গুনতে হচ্ছে।

এতে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। মোট ঋণের প্রায় ৭৬ শতাংশই উচ্চ সুদ ও কঠিন শর্তের আওতায় থাকায় এসব শর্ত বাস্তবায়নে ভোক্তা পর্যায়েও চাপ বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈদেশিক ঋণের অপব্যবহার ও অনিয়মের দায় শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হচ্ছে।

সরকারি ও বেসরকারি খাতের নেওয়া অধিকাংশ বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে রাষ্ট্র, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা বাণিজ্যিক ব্যাংকের গ্যারান্টি রয়েছে। ফলে অনেক ঋণগ্রহীতা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও বা কারাগারে থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে ঋণ শোধ করতে হচ্ছে। বেসরকারি খাতের কিছু ঋণ ফোর্স লোনে রূপান্তর করে বাজার থেকে উচ্চমূল্যে ডলার কিনে পরিশোধ করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, স্বাধীনতার পর দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের ৭৮ শতাংশই আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া হয়েছে। বাকি ২২ শতাংশ অন্যান্য সরকারের আমলে নেওয়া হয়।

 

 

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ মোকাবিলা করছে। আওয়ামী লীগ আমলের প্রায় ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত সরকারি খাতেই পরিশোধ হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার। আগামী অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

 

সরকারি বৈদেশিক ঋণ সাধারণত রাজস্ব আয় বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার অর্থ থেকে পরিশোধ করা হয়। তবে বর্তমানে অর্থনৈতিক মন্দা ও কম রাজস্ব আয়ের কারণে সরকারকে স্থানীয়ভাবে ঋণ নিয়ে ডলার কিনে বৈদেশিক ঋণ শোধ করতে হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও ব্যাপক বেড়েছে। ২০০৯ সালে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ ছিল ১৬৯ ডলার, যা আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে বেড়ে দাঁড়ায় ৬০৭ ডলারে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা আরও বেড়ে ৬৫৭ ডলারে পৌঁছায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০০৯ সালের শুরুতে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ২ হাজার ২৭৯ কোটি ডলার। ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৩৪১ কোটি ডলারে। অর্থাৎ এই সময়ে মোট বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৮ হাজার ৬২ কোটি ডলার।

সম্প্রতি প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি খাতের ঋণ পরিশোধের চাপ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে চাপে ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি ব্যয় বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বর্তমানে রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয়, বিদেশি বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদান থেকে আসা বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে আমদানি ব্যয়, সেবা খাতের খরচ ও বেসরকারি ঋণ পরিশোধের পর অতিরিক্ত ডলার অবশিষ্ট থাকছে না। ফলে রিজার্ভ থেকেই সরকারি ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে।

 

আগে বছরে বৈদেশিক ঋণ বাবদ ১৫০ থেকে ২০০ কোটি ডলার পরিশোধ করা হলেও এখন সেই পরিমাণ বেড়ে গত অর্থবছরে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। চলতি অর্থবছরে তা ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ দ্রুত বাড়লেও একই অনুপাতে রিজার্ভ বাড়েনি। ফলে ঋণের বিপরীতে রিজার্ভের অনুপাত ২০২০ সালের ৬০ শতাংশ থেকে বর্তমানে ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

 

সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈদেশিক ঋণ যদি বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ায়—এমন প্রকল্পে ব্যয় করা হতো, তাহলে ঝুঁকি কম থাকত। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া অধিকাংশ ঋণ স্থানীয় মুদ্রানির্ভর প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণের অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে একদিকে ঋণের দায় বেড়েছে, অন্যদিকে অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত সুফল আসেনি। এর প্রভাব এখন দেশের রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক চাপ তৈরি করছে, যার বোঝা বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

নবীনতর পূর্বতন

Smartwatchs