লুটপাটের মেগা প্রকল্প যখন জনগণের গলার কাঁটা

 

লুটপাটের মেগা প্রকল্প যখন জনগণের গলার কাঁটা

লুটেরা আওয়ামী সরকার শুধু অবকাঠামো খাতে পরিকল্পনাহীন কয়েকটা মেগা প্রকল্প তৈরি করে সেগুলোকে উন্নয়ন বলে দেশবাসীকে ধোঁকা দিয়েছে। মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে বিগত সরকার বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ এবং লাখ লাখ কোটি টাকা লুটপাট করেছে। আওয়ামী মাফিয়া চক্র বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লুটের টাকা বিদেশে পাচার করেছে।

আওয়ামী আমলের অন্যতম মেগা প্রকল্প ছিল চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল। কিন্তু উদ্বোধনের দুই বছর পর এই টানেল যেন প্রত্যাশার তুলনায় বড় বেশি ফাঁকা। যে সুড়ঙ্গপথ ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রামে এক নতুন অর্থনৈতিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা দিয়েছিল, সেই কর্ণফুলী টানেল এখন আশানুরূপ গাড়ি না পেয়ে অনেকটা নিঃসঙ্গ। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৬ হাজার গাড়ি কম চলায় এই সুবিশাল বিনিয়োগের সুফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে কর্ণফুলী টানেল প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা লোকসান গুনছে। সাধারণ জনগণের কাছে এই প্রকল্পটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ‘সাদা হাতি’ মনে হয়েছে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে কর্ণফুলী টানেলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো কালুরঘাট সেতু। বর্তমানে কালুরঘাট সেতুর ওপর ঝুঁকি নিয়ে সামান্য সংখ্যক পরিবহন চলাচল করছে। বোয়ালখালী ও পটিয়ার জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল পুরোনো কালুরঘাট সেতু ভেঙে একটি নতুন সেতু নির্মাণ করা। কিন্তু বিগত সরকার মেগা প্রকল্প থেকে অবৈধ অর্থ আত্মসাতের লোভে তা বাস্তবায়ন করেনি।

বিজ্ঞাপন

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা তুলে ধরতে শ্বেতপত্র কমিটি এবং অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তাদের প্রতিবেদনে উঠে আসে, আওয়ামী লীগ আমলে বাস্তবায়িত আটটি মেগা প্রকল্পে প্রারম্ভিক ব্যয়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার বা ৯১ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে। দুর্বল পরিকল্পনা, বাস্তবায়নে বিলম্ব ও দুর্নীতি এই ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শ্বেতপত্র কমিটি ও টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে আমলে নেওয়া আট প্রকল্প হলো—পদ্মা সেতু, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, যমুনা রেলওয়ে সেতু, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, এমআরটি লাইন-৬ (উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল), বিআরটি-৩ (বিমানবন্দর-গাজীপুর বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট) এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল। শুরুর দিকে এই আট প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। কিন্তু নির্মাণ শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার বা ২ লাখ ২৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকায়।

বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পগুলো বর্তমানে চড়া ঋণের সুদ, নির্মাণব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘসূত্রতা এবং আয়ের তুলনায় অত্যধিক পরিচালন ব্যয়ের কারণে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে। অনেক প্রকল্প এখন দেশ ও দেশের মানুষের জন্য গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে বাংলাদেশ রেলওয়েতে সোয়া লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা হলেও এর সুফল পাচ্ছেন না সাধারণ যাত্রীরা। বরং ১৬ বছরে প্রতিষ্ঠানটি লোকসান গুনেছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। সেটি অব্যাহত ছিল গত অর্থবছরেও, যার পরিমাণ তিন হাজার কোটি টাকা। যে উন্নয়নে এত ব্যয়, সেখানে প্রতি পদে পদে ছিল দুর্নীতি ও লুটপাট। এ কারণে অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা বাড়েনি। ঢাকা-কক্সবাজার ও ঢাকা-যশোর রুটে (খুলনা পর্যন্ত) ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। সমীক্ষা অনুযায়ী, এই দুই রুটে ১৫০টি ট্রেন চলার কথা। অথচ এই দুই রুটে ট্রেন চলছে মাত্র ১০টি। আবার উচ্চমূল্যে কেনা ১৪০ কিলোমিটার গতিতে চলার উপযোগী ইঞ্জিন ও কোচ চলে গড়ে ৫৬ কিলোমিটার গতিতে। কোনো কোনো পথে ট্রেন চলে মাত্র ১৫-৩০ কিলোমিটার গতিতে। ফলে যেখানে যাত্রার সময় লাগার কথা দু-চার ঘণ্টা, সেখানে চার থেকে ১২ ঘণ্টা সময় ব্যয় হচ্ছে। এতে শুধু যাত্রীরাই ভোগান্তি পোহাচ্ছেন না, পরিচালন ব্যয়ও ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হচ্ছে। রেলের নিম্নগতির কারণ অনুন্নত রেললাইনসহ আরো অনেক বিষয়।

মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে উচ্চব্যয়ের প্রকল্পগুলোর ৯৫ শতাংশই করা হয়েছে বৈদেশিক ঋণে। এসব ঋণ পরিশোধের চাপ এখন ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। দুদকের মামলা ও রেল পরিকল্পনা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোলিং স্টক কেনা থেকে রেলপথ নির্মাণ—সব প্রকল্পেই দুর্নীতি ও লুটপাটের প্রমাণ মিলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে একটি ইঞ্জিনের বাজারমূল্য আট কোটি থেকে ১৩ কোটি টাকা। অথচ সেই ইঞ্জিন কেনা হয়েছে ৩৩ কোটি থেকে ৩৯ কোটি টাকায়। নতুন রেলপথ নির্মাণে ব্যয় বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি। ঢাকা-পায়রা বন্দর প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২৫০ কোটি টাকা, ঢাকা-যশোর ২০৩ কোটি টাকা এবং দোহাজারী-কক্সবাজার প্রকল্পে ১৩৯ কোটি টাকা। অথচ বিশ্বে প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ ব্যয় ২৩ কোটি থেকে ৩১ কোটি টাকা।

আওয়ামী লীগ শাসনামলের তিন বছরের প্রকল্প ১৫ বছরেও সমাপ্ত না হওয়ার নজির রয়েছে, যার মধ্যে এমন কোনো প্রকল্প নেই যেখানে সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে লুটপাট করা হয়নি। ২০১২ সালের ঢাকা-টঙ্গী তৃতীয় ও চতুর্থ লেন ১৭ বছরে সমাপ্ত হবে কি না, তা অনিশ্চিত। তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের ব্যয় ছিল প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। পরে সময়ের সঙ্গে ব্যয় বাড়িয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকায় ঠেকানো হয়েছে। উপমহাদেশের অন্যতম ব্যয়বহুল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নাম ‘লালখান বাজার-বিমানবন্দর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’। প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করতে খরচ হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা! প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয়েছে প্রায় ২৭০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের ১১ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ২৫০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। এখন ব্যয় হচ্ছে ৪ হাজার ২৯৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। কিন্তু ২০২২ সালে নকশা ‘সংশোধন’ করে এক লাফে আরো ১ হাজার ৪৮ কোটি টাকা বাড়ানো হয়। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সমাপ্ত না হওয়ায় চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে নগরবাসী।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে যে পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। পৃথিবীর কোনো দেশে এক কিলোমিটার ফ্লাইওভার তৈরিতে ২৭০ কোটি টাকা ব্যয়ের নজির নেই। অনেকটা একই সময়ে ভারতের তামিলনাড়ুতে কৈয়ামবেদু ফ্লাইওভার নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে খরচ পড়েছে ভারতীয় মুদ্রায় ৯৫ কোটি রুপি। এটি চার লেনের ফ্লাইওভার। তামিলনাড়ুর রিটটেরি, পালাভারাম ও মেধাবাকাম এলাকায় নির্মিত তিন লেনের ফ্লাইওভারগুলোর নির্মাণব্যয় হয়েছে প্রতি কিলোমিটারে ৪৮ কোটি রুপি । এ উপমহাদেশে বর্তমান সময়ে চার লেনের ফ্লাইওভার নির্মাণে স্বীকৃত ব্যয় হিসেবে বাংলাদেশেই ব্যয় বেশি ধরা হয়।

সরকারের জন্য এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে গাজীপুর-এয়ারপোর্ট বিআরটি প্রকল্পটি। ২০১৩ সালে নির্বাচনি চমক হিসেবে ভিত্তি স্থাপনের পর দীর্ঘ এক যুগ কচ্ছপ গতিতে কাজ করতে গিয়ে জনভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। অসতর্কতায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে একাধিকবার। ‘মাত্র ৩০ মিনিটে গাজীপুর থেকে এয়ারপোর্ট’—এমন স্লোগান দিয়ে প্রকল্পটি নেওয়া হলেও বাস্তবে যানজট থেকে মুক্তি মেলেনি এই রুটে চলাচলকারীদের। ভুল পরিকল্পনা, ত্রুটিযুক্ত নকশা, জরিপ ও সমীক্ষা ছাড়া ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকার প্রকল্পটি এখন জনগণের জন্য জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত টোল খরচের জন্য অধিকাংশ গাড়ি ফ্লাইওভার দিয়ে চলাচল করছে না।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

নবীনতর পূর্বতন

Smartwatchs