সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ঢাবি সাংবাদিক সমিতির মানববন্ধন

 

অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন করে ঢাবি সাংবাদিক সমিতি। এতে উপস্থিত ছিলেন সমিতির সাবেক ও বর্তমান সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সদস্যরা

 অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন করে ঢাবি সাংবাদিক সমিতি। এতে উপস্থিত ছিলেন সমিতির সাবেক ও বর্তমান সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সদস্যরা ©

পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে রাজধানীর শাহবাগ থানার ভেতরে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলার প্রতিবাদে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিতের দাবিতে মানববন্ধন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি। শনিবার (২৫ এপ্রিল) দুপুর ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধনে সাংবাদিক সমিতির বর্তমান সদস্যদের পাশাপাশি সাবেক সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। কর্মসূচিতে সংহতি জানান ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ আবু হানিফ, দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সম্পাদক ও ঢাবি সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি মাহবুব রনি, দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক ও সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম রুবেল, সমিতির সাবেক কার্যনির্বাহী সদস্য ইয়ামিন সাজিদ, বিডিনিউজ২৪-এর সাংবাদিক ও সমিতির সাবেক সভাপতি মাসুম বিল্লাহসহ অনেকে।

এ ছাড়া সংহতি প্রকাশ করেন দিনের আলোর সম্পাদক ফজলুর রহমান জুলফিকার, দৈনিক গণজাগরণের সাংবাদিক মো. আবু সাঈদ, চায়না গ্লোবাল টেলিভিশন নেটওয়ার্কের (সিজিটিএন) বাংলাদেশ প্রতিনিধি হোসাইন তারেক, সাংবাদিক ও ফ্যাক্টচেকার কদরুদ্দিন শিশির, দৈনিক এদিনের সাংবাদিক সুমন্ত চক্রবর্তী ও আল জাজিরার সাংবাদিক মওদুদ আহমেদ সুজন।
 
মানববন্ধনে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘গণমাধ্যমগুলো যখন সত্য প্রচারের পরিবর্তে শক্তির প্রচার করে, তখন সেই সমাজ, সেই রাষ্ট্র ফ্যাসিবাদের দিকে পা বাড়ায়। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যারা জনগণের অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত থাকে, জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে, তারা যখন জনগণকে নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে শাসকশ্রেণির পক্ষে অবস্থান নেয় এবং নির্যাতিতের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে তাদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করায়, তখন সেই রাষ্ট্রটি চূড়ান্ত ফ্যাসিবাদের রূপ ধারণ করে।’

আরও পড়ুন: বুটেক্সের ল্যাবে পুরোনো ও অচল মেশিন, ব্যাহত ব্যবহারিক শিক্ষা কার্যক্রম

তিনি বলেন, ‘যারা সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্যদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালিয়েছে, নির্যাতন করেছে, তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এটি যদি করা না হয়, তাহলে আমি মনে করব, সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ বিগত ১৭ বছরে যেভাবে অধিকার বঞ্চিত হয়েছে, সাংবাদিক সমাজ যেভাবে নির্যাতিত-নিষ্পেষিত হয়েছে, আবার সে পথে যদি এই সরকার হাঁটতে চায়, তাহলে আমরা যে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমরা যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলাম, সে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে এবং এই সরকার আবার নতুন রূপে ফ্যাসিবাদে আবির্ভূত হবে। এর পরিণতি খুব খারাপ।’

তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা এই হামলার সঙ্গে যদি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা জড়িত থাকে, সন্ত্রাসীরা জড়িত থাকে, তাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনুন।’

প্রশাসনের উদ্দেশে শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সাংবাদিকরা সেখানে দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিল, পুলিশ সেদিন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আমি আইজিপিকে অনুরোধ করব, তাদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে এই রাষ্ট্রীয় বাহিনী থেকে বরখাস্ত করতে হবে।’

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সম্পাদক ও ঢাবি সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি মাহবুব রনি বলেন, ‘সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলার ঘটনায় মামলাটি এখন পর্যন্ত লিপিবদ্ধ হয়নি। আপনাদের কম্পাউন্ডেই এই বিশৃঙ্খলা এবং হামলা হয়েছে। সুতরাং পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি আমাদের দাবি এবং আহ্বান থাকবে অনতিবিলম্বে সেই মামলা গ্রহণ করুন। মামলা করে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষার্থীদের ওপর বা যে সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়েছে, তারা এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী। আবার এখানে প্রাথমিকভাবে হামলাকারী হিসেবে চিহ্নিত যাদের নাম এসেছে, তারাও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এই হামলাকারী শিক্ষার্থীদেরও অনতিবিলম্বে চিহ্নিত করে বিচার করতে হবে, শাস্তি দিতে হবে।’

মাহবুব রনি আরও বলেন, ‘হামলায় জড়িত যারা শাহবাগ থানায় গিয়েছিলেন, তারা ছাত্রদলের ব্যানারে গিয়েছিলেন। সংগঠন হিসেবে ছাত্রদলও এ হামলার দায় এড়াতে পারে না। তারা একটি তদন্ত কমিটি করেছে, এ জন্য সাধুবাদ পেতে পারে। কিন্তু অনতিবিলম্বে দোষীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এই দাবি আমাদের থাকল।’

দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক ও ঢাবি সাংবাদিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম রুবেল বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক  হিসেবে আজকে এখানে দাঁড়িয়েছি আমাদের কিছু ছোট ভাইয়ের জন্য, যারা এই ক্যাম্পাস থেকে একটি মহান দায়িত্ব পালন করছেন। এই ক্যাম্পাসে কোনো নির্যাতন হলে তারাই সবার আগে লিখে জাতিকে জানান। আজকে তাদের ওপরই অন্যায়ভাবে হামলা হয়েছে। সেটির বিচারের দাবিতে আমরা এখানে দাঁড়িয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘আপনারা দেখবেন, তাদের ওপর যে হামলা হয়েছে, সেটির প্লেস অব অকারেন্স কোথায়? সেটি হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটে শাহবাগ থানার মধ্যেই।’

সিরাজুল ইসলাম রুবেল আরও বলেন, ‘অপরাধ সংঘটনের স্থান হচ্ছে শাহবাগ থানার মধ্যেই এবং এ হামলার বিচারের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতি গতকালকে শাহবাগ থানায় গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে তারা চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু থানার যিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, ভারপ্রাপ্ত অফিসার, ওসি সাহেব তাকে চার ঘণ্টায় শাহবাগ থানায় পাওয়া যায়নি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা অপরাধীর পক্ষ নেবেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতীতে আমরা দেখেছি, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমাদের ওপর নানা সময়ে হামলা হয়েছে। সেটির বিচার আমরা পেয়েছি। সে সময় আমরা যদি বিচার পেয়ে থাকি, তাহলে এখন ৫ আগস্টের পরে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি থাকার কথা। এত দেরি হচ্ছে কেন?’

সাংবাদিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন বলেন, ‘গত পরশু শাহবাগ থানার অভ্যন্তরে ছাত্রদলের কতিপয় সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির ১০ জন সদস্যকে নির্মমভাবে পিটিয়েছে। আমি গত আট বছর ধরে সাংবাদিকতা করছি। এ ধরনের ঘটনা গত আট বছরে কখনো দেখিনি। শিক্ষার্থীরা যখন আন্দোলনে আসতেন, তখন তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি। অথচ আজ তাদের ওপরই হামলা করল ছাত্রদল।’

আরও পড়ুন: বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিত যুক্তরাষ্ট্রের, জানা গেল কারণ

মোতাহার হোসেন আরও বলেন, ‘ছাত্রদলের এই ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ছাত্রদল সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু ব্যবস্থা না নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিক সমিতিসহ সাংবাদিকদের নিয়ে নানা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি কখনো কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না।’

সমিতির আরেক সাধারণ সম্পাদক মাহাদী হাসান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উভয়ই নানাভাবে টালবাহানা করে সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিচারকে বিলম্বিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এই টালবাহানা করার মাধ্যমে আমাদের দমিয়ে রাখা যাবে না। যদি আমাদের দাবি দ্রুত সময় আদায় না হয় সারা দেশে যতগুলা ক্যাম্পাস আছে, যতগুলো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে তাদের নিয়ে আমরা কঠিন কর্মসূচিতে বাধ্য হব।’

সাংবাদিক সমিতির নবনির্বাচিত সভাপতি মানজুর হোসাইন মাহি বলেন, ‘শাহবাগ থানায় ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মী আমাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেন এবং আমরা তাৎক্ষণিকভাবে এর প্রতিবাদ জানালে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে তারা আমাদের ওপর হামলা চালান, যা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও দুঃখজনক। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যে দাবিগুলো জানিয়েছি, আমি আশা করি তারা অতি দ্রুত সেগুলো মেনে নেবে এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

মানববন্ধনে বক্তারা সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত, মামলা গ্রহণ, আইননি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্যাম্পাসে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

নবীনতর পূর্বতন

Smartwatchs