
তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও জ্বালানি সংকটে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিদিনই বাড়ছে উৎপাদন আর চাহিদার ব্যবধান। সরকারের হিসেবে ঘাটতি প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে তা চার হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে কোনো কোনো সময়। রাজধানীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে গ্রামাঞ্চলে ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সূত্র জানায়, দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই পাওয়ার প্লান্টের চালু থাকা সবশেষ ইউনিটটিরও উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি ভারতের আদানি পাওয়ার থেকেও বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে গেছে। এদিকে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়িয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা। এরই অংশ হিসেবে উৎপাদন ও সরবরাহ ঠিক রাখতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের দুই হাজার ৬৭ কোটি পাঁচ লাখ টাকা ছাড়ের অনুমোদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
বিদ্যুৎ বিভাগসহ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, বুধবার মধ্যরাতে আদানি পাওয়ার থেকে বিদ্যুৎ এসেছে এক হাজার ৪৯৭ মেগাওয়াট। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায় এসেছে ৭৬০ মেগাওয়াট। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন একদিনের ব্যবধানে অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন এ বিভাগের কর্মকর্তারা।
শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেগুলোয় গ্যাস সরবরাহ করতে গিয়ে সার কারখানাগুলোও প্রায় বন্ধ রাখতে হচ্ছে। পিডিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওনা প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। আদানির কাছ থেকেও দ্বিগুণ দামে বিদ্যুৎ আমদানি করতে হচ্ছে সরকারকে। তাদের বিপুল পরিমাণ বকেয়ার জন্য চাপ আসছে। চলতি গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জরুরি ভিত্তিতে ২০ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে পিডিবি। এ টাকা না পেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না।
কর্মকর্তারা জানান, এখন বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। তাদের পক্ষে এটির জোগান দেওয়া খুবই কঠিন হবে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবস্থায় চাহিদামতো গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েল জোগান দেওয়াও কঠিন হবে বলে মনে করেন তারা।
উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ লোডশেডিং
দেশের প্রথম বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক ৫২৫ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদনক্ষম দুটি ইউনিটই বিকল হয়ে পড়ায় উত্তরাঞ্চলের আট জেলায় ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে। কোথাও এক ঘণ্টা পরপর আবার কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে তিনটি ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে ১ ও ২ নম্বর ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১২৫ মেগাওয়াট করে এবং ৩ নম্বর ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ২৭৫ মেগাওয়াট। কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতায় ২ নম্বর ইউনিটটি সাড়ে চার বছর বিকল হয়ে আছে। ২০২০ সালের নভেম্বর যান্ত্রিক ত্রুটিতে ২ নম্বর ইউনিটটি বন্ধ হয়ে গেলেও তা মেরামতের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সেই থেকে ১ ও ৩ নম্বর ইউনিট চালু রেখে ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার বিপরীতে দুটি ইউনিটে ২৬০-২৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো।

ঢাকায়ও হবে লোডশেডিং
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল জাতীয় সংসদে বলেন, সরকার গ্রাম ও শহরের মধ্যে লোডশেডিং বৈষম্য দূর করতে শহরেও লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শহরের মানুষ আরামে থাকবে আর গ্রামের মানুষ কষ্টে থাকবে এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। সেই বৈষম্যমুক্ত করার জন্য শহরেও প্রয়োজনে লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যাতে কৃষকরা তাদের সেচের জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পেতে পারে।
তিনি বলেন, এই উত্তপ্ত গরমে, গ্রীষ্মে আমাদের অনেককেই বিদ্যুৎ সমস্যায় নাজেহাল হতে হয়েছে। যে কথাটি স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হচ্ছে, এই সমস্যা একদিনের নয়। পুঞ্জীভূত সমস্যার দায় কোনোভাবেই বর্তমান নির্বাচিত সরকার বা কারো নয়। এর দায় বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অব্যবস্থাপনার, যা আমাদের সবাইকে নিতে হচ্ছে। বর্তমানে উৎপাদন সক্ষমতা কাগজে-কলমে অনেক বেশি থাকলেও বাস্তবতার সঙ্গে এর গরমিল রয়েছে।