
ভালোবাসা শুধু অনুভূতির প্রকাশে সীমাবদ্ধ নয়—প্রয়োজনে তা আত্মত্যাগের মাধ্যমেও প্রমাণিত হয়। শরীয়তপুরের মো. জসিম উদ্দিন সেই সত্যকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। দীর্ঘদিনের সঙ্গী মিনারা বেগমের জীবন সংকটে নিজের একটি কিডনি দান করে তিনি মানবিকতা ও দাম্পত্য ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হলে জেলায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অনেকেই এটিকে দায়িত্ববোধ, ত্যাগ এবং সত্যিকারের ভালোবাসার অনন্য উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হন ৩২ বছর বয়সী মিনারা বেগম। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে, তার দুটি কিডনিই বিকল হয়ে গেছে। একই সঙ্গে পেটে একটি টিউমারও শনাক্ত হয়। এতে পুরো পরিবারে নেমে আসে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা।
পরবর্তীতে মিনারাকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং টিউমারের চিকিৎসা সম্পন্ন হয়। তবে অর্থাভাবে তখন কিডনি প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়নি। সময়ের সঙ্গে তার শারীরিক অবস্থা আরও অবনতির দিকে যেতে থাকলে উপযুক্ত কিডনি দাতার খোঁজ শুরু হয়। একপর্যায়ে মিনারার মা কিডনি দিতে সম্মতি জানালেও স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণে তা সম্ভব হয়নি।
এমন সংকটময় মুহূর্তে স্বামী মো. জসিম উদ্দিন (৩৬) দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন স্ত্রীকে নিজের একটি কিডনি দেওয়ার। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে গত ৫ মার্চ ঢাকার শ্যামলীর সিকেডি অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়। বর্তমানে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন মিনারা বেগম। স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় ভাড়া বাসায় থেকে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অপেক্ষায় আছেন তিনি।
আরও জানা যায়, শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কুচাইপট্টি ইউনিয়নের বসকাঠি গ্রামের বাসিন্দা এই দম্পতির বিয়ে হয় ২০০৭ সালে। দাম্পত্য জীবনের এক বছর ছয় মাস পর জন্ম নেয় তাদের একমাত্র সন্তান তামিম আল মারুফ, বর্তমানে সে ঢাকায় নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। চাকরির সুবাদে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় বসবাস করছেন জসিম উদ্দিন।
২০২৪ সালের শুরুতে মিনারা বেগমের অসুস্থতা ধরা পড়ার পর থেকে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা চলতে থাকে। কিন্তু কিডনি জটিলতা ক্রমেই গুরুতর হয়ে ওঠে। সেই কঠিন সময়ে স্বামীর এই আত্মত্যাগ শুধু একটি জীবন রক্ষা করেনি, বরং মানবিক ভালোবাসার গভীরতাকেও নতুনভাবে তুলে ধরেছে।
মিনারা বেগম বলেন, কিডনি সমস্যার কথা জানার পর আমরা খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। স্বামীর সীমিত আয় ও সন্তানের পড়াশোনা মিলিয়ে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। আমার মা কিডনি দিতে চাইলেও শারীরিক সমস্যার কারণে তা সম্ভব হয়নি। তখন আমার স্বামী নিজেই এগিয়ে আসেন। আমি তাকে অনেকবার নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। আল্লাহর রহমতে এখন আমরা দুইজনেই ভালো আছি। আমাদের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।
স্বামী জসিম উদ্দিন বলেন, স্ত্রীর এমন অবস্থায় কী করা উচিত বুঝতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিই—বাঁচলে একসঙ্গে বাঁচব, না হলে একসঙ্গেই মৃত্যুকে বরণ করবো। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী সব পরীক্ষা শেষে নিজের ইচ্ছাতেই কিডনি দান করেছি। এতে আমি মানসিকভাবে অনেক স্বস্তি পেয়েছি। উল্লেখ্য, স্ত্রী কখনোই আমাকে কিডনি দিতে বলেননি—এটি সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
কুচাইপট্টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএম নাসির উদ্দিন স্বপন বলেন, স্ত্রীর জীবন রক্ষায় নিজের কিডনি দান করে জসিম উদ্দিন সত্যিই বিরল এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এটি ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের অসাধারণ নিদর্শন। মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি, এই দম্পতি সুস্থ ও সুখি থাকুক।