
রাজধানীর সবচেয়ে বড় কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাট উত্তরা দিয়াবাড়িতে গভীর রাতে মাইকিং করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিপুল অংকের টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত প্রায় ১২টার দিকে হঠাৎ মাইকিং করে জানানো হয় যে, হাটে থাকা প্রতিটি গরুর জন্য এক হাজার টাকা করে দিতে হবে।
খামারী ও বেপারীরা বলছেন হাটে অন্তত দুই থেকে আড়াই লাখ গরু এসেছে। সে হিসেবে এই চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা। ইজারাদার প্রতিষ্ঠান এস এফ করপোরেশনের কর্মীরা কখনো একে ‘শেড খরচ’ আবার কখনো ‘বকশিস’ হিসেবে দাবি করে ব্যবসায়ীদের বাধ্য করছে টাকা দিতে।
উত্তরার দিয়াবাড়ি হাটে গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে বিভিন্ন বেপারীদের সঙ্গে কথা বললে তারা এ অভিযোগ করেন।
পাবনার পশু চিকিৎসক আজিজুল হক জানান, হাটে পানি নিষ্কাশনের অব্যবস্থাপনা, কাদা-পানি আর টয়লেট সংকটসহ নানা অব্যবস্থাপনার কারণে এমনিতেই পশুর দাম কম। যার ফলে তার ১৩টি গরুতে প্রায় পৌনে দুই লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এর ওপর রাসেল, তুষার ও মনসুরসহ বেশ কয়েকজন ব্যক্তি এসে তাকে শাসিয়ে গরু প্রতি এক হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করেছে। তার মতে, হাটে আসা অন্তত দুই থেকে আড়াই লাখ গরু থেকে এভাবে টাকা তোলা হলে চাঁদাবাজির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা।
আজিজুল বলেন, হাটের মূল খরচ ২০-২৫ কোটি টাকা বেপারীদের কাছ থেকে তোলাই হয়তো তাদের লক্ষ্য। সেজন্যই মঙ্গলবার দিবাগত রাত পৌনে ১২ টা বা ১২ টার দিকে হঠাৎ করে মাইকিং করে বলা হল শেড বাবদ এক হাজার টাকা করে দিতে হবে গরু প্রতি। অথচ আমার গরু শেডের বাইরে থাকলেও আমাকে দিতে হলো সম্পূর্ণ টাকাই। কান্না জড়িত কণ্ঠে আজিজুল বলেন, এখনও যদি আমাদের এধরণের চাঁদাবাজির মধ্যে পড়তে হয় তাহলে আসলে আমরা মুক্তি পাব কবে?

কুষ্টিয়ার কুমারখালি থেকে ১০টি গরু নিয়ে আসা মো. মাসুদ রানা বলেন, কাল রাত আনুমানিক ১২টার দিকে হঠাৎ মাইকিং করে বলা হলো বেপারিরা আপনারা গরু প্রতি এক হাজার করে বকশিস দিবেন। টাকা না বকশিস। বিক্রি হলে দিবেন। না হলে দেওয়ার দরকার নেই। এরপর সকালে এসে একজন আমার কাছে জানতে চাইল কয়টা গরু বিক্রি হয়েছে। আমি দুইটা বলার পর দুই হাজার টাকা চাইলো। যদিও আমি তখন দেইনি। তবে পরে আবার আসবে বলেছে।
চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জ থেকে ২০টি গরু নিয়ে এসেছেন মো. হাবিব। তিনি বলেন, আমার চারটি গরু বিক্রি করেছি। চার গরুতে লোকসান হয়েছে ৬০ হাজার টাকা। এখন ঋণ করে গরু হাটে নিয়ে এসেছিলাম। এখন খেত-খামারে বদলা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। নিরাপত্তা বিষয়ে তিনি বলেন, হাটে কোন নিরাপত্তা নেই। পাশের খামারির দুইটা গরু চুরি হয়েছে। এরপরতো কাদা-পানি আছেই। এরপরে আবার চাঁদা। এসব আমাদের ওপর জুলুম। ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ যাকে বলে আরকি। হাটে অন্তত দুই থেকে আড়াই লাখ গরু আসছে। এসবের হাসিলেইতো তাদের সব খরচ ওঠার পর আরো অনেক লাভ হবে। সেখানে আমাদের সাথে এই জুলুম।
নাটোরের সিংড়া থানা থেকে আসা আব্দুস সবুর এসেছেন দুইটি মহিষ নিয়ে। তিনি জানান, আমরা এই হাটে আর কখনোই আসব না। পুরো হাটেই অব্যবস্থাপনা। এখানে টেকাই দায়। দুইটা মহিষ যে দরে কিনেছি, ছয় মাস লালন পালন করার পরও এখন সে দরেই বিক্রি করতে হচ্ছে। হাটের অব্যবস্থাপনার জন্যই আমাদের এই অবস্থা। এরপর আবার এখন বেপারীদের বাধ্য করা হচ্ছে এক হাজার টাকা করে দেওয়ার জন্য। এইটাকে তারা বলছে শেড খরচ। কিন্তু এই খরচতো তাদের হাসিল থেকে খরচ করার কথা।
নাছির এগ্রো ফার্মের ডিরেক্টর অপি আমার দেশকে বলেন, আমাদের একেকটা গরুতে ১৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে তারা হাসিল পাচ্ছে। এরপর আবার মাইকিং করলো গরু প্রতি টাকা দেওয়ার জন্য। আমার যেহেতু বড় গরু তাই কত করে সেটা এখনো নিশ্চিত না। কী করবো বুঝতেছি না। তবে চাঁদা না দিতে পারলেই ভালো লাগতো। পানিতে ভিজছে আমার গরুগুলো। একটু পর পর পানি সেচতে হচ্ছে আমাদের নিজেদের লোক নিয়েই।
এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য ইজারাদার প্রতিষ্ঠান এস এফ করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী ঢাকা উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মো. শেখ ফরিদ হোসেনকে ফোন করা হলে তিনি তা রিসিভ করেননি। পরে দিয়াবাড়ি হাটের এক নম্বর স্টলে তিনি আছেন জানতে পেরে সেখানে গিয়ে দেখা যায় এক বেপারীর সঙ্গে চাঁদার টাকা নিয়ে বাক-বিতন্ডা হচ্ছে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক ভলেন্টিয়ারের।
ভলেন্টিয়ার ওই বেপারীকে ধরে নিয়ে এসে এক নম্বর হাসিল ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তিকে ইজারাদার পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘ভাইকে এবার জিগান দুইটা গরুর লাইগা দুই হাজার টাকা দিতে হইবো’। পরে ওই বেপারি চাঁদা দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলে তাকে চাঁদা দিতে বাধ্য করা হয়। এসময় গরু বিক্রেতাকে ধমক ও অশ্রাভ্য ভাষায় গালি দেন এক ব্যক্তি। ওই ব্যাক্তির গলায় থাকা ইজারা প্রতিষ্ঠানের কার্ড থেকে জানা যায় তার নাম উমর ফারুক।
পরে এসব বিষয়ে ইজারাদার ফরিদের কাছে জানার জন্য দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। সেসময় তিনি হাসিল ঘর থেকে নেমে আসলে তার কাছে পরিচয় দিয়ে কথা বলতে গেলে তিনি বলেন, ভাই এখন অনেক ব্যস্ত আছি, দেখতেই পারছেন। রাতে কল দিয়েন ভাই অবশ্যই সব নিয়ে কথা বলব। পরবর্তীতে তাকে রাতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
দুই সিটি কর্পোরেশন নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, নির্ধারিত হাসিল ছাড়া অন্য কোনোভাবে অর্থ আদায়ের সুযোগ ইজারাদারের নেই। সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তরা বলছেন, কেউ অভিযোগ করলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।