চট্টগ্রাম নগর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে পাহাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। দীর্ঘদিন ধরে ‘ছিন্নমূল জনপদ’ পরিচয়ে থাকা এ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্যের অভিযোগ আছে।

গত ১৯ জানুয়ারি বিকেলে সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে র‍্যাবের ডিএডি আব্দুল মোতালেব (৪৫) নৃশংস গণপিটুনির শিকার হয়ে নিহত হন। গুরুতর আহত হন র‍্যাবের আরও দুই সদস্য ও একজন সোর্স।

আরও দেখুন
পানি
রিপোর্ট
সিলেট
Dhaka

ঘটনার এমন দুটি ভিডিও এবং ঘটনাস্থলে থাকা র‍্যাব সদস্যদের বর্ণনা থেকে উঠে আসে ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, মোতালেবকে একটি ঘরের ভেতর ফেলে রাখা হয়েছে। লাঠি দিয়ে অন্তত ৮–১০ জন একযোগে তাঁর ওপর হামলে পড়ে। শুরুতেই তাঁর পোশাক টেনে ছিঁড়ে হাত-পা বেঁধে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে ফেলা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী র‍্যাব সদস্যদের ভাষ্য, প্রথম দিকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন মোতালেব। কিন্তু প্রতিবারই লাঠির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিলেন। একপর্যায়ে তাঁকে টেনে রুমের একপাশে নিয়ে মাথা লক্ষ্য করে ধারাবাহিক আঘাত করা হয়। কেউ কাঁচা গাছের মোটা লাঠি দিয়ে আঘাত করছেন, কেউ আবার ইট-পাথর চেপে ধরছেন হাঁটু ও পায়ের আঙুলে। রুমের মেঝেতে রক্তের বড় বড় দাগ ছড়িয়ে ছিল।

প্রথম দফায় হামলার পর মোতালেবসহ চার জনকে একটি সিএনজি অটোরিকশায় তুলে তিন কিলোমিটার দূরের নিজামপুর এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আরেকটি ঘরে দ্বিতীয় দফায় হামলা শুরু হয়। সেই ঘরেও দেয়াল–মেঝেতে রক্তের ছাপ দেখা গেছে। এ দফায় ১৫–২০ জন মিলে তাঁদের ওপর চড়াও হয়।

আরও দেখুন
পানি
সিলেট
Dhaka
রিপোর্ট

র‍্যাবের এক সদস্য বলেন, মোতালেব ভাই তখন আর কথা বলতে পারছিলেন না, শুধু শ্বাস নিচ্ছিলেন। মাথাটা থেঁতলে গিয়েছিল। হামলাকারীদের আক্রমণ থামানোর কোনো ইচ্ছাই ছিল না।

দ্বিতীয় দফা পিটুনির শেষ দিকে মোতালেবের দেহে আর কোনো নড়াচড়া দেখা যাচ্ছিল না। কয়েকজন হামলাকারী তখনও তাঁর পায়ে কাঠ ও পাথর চাপাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর তাঁকে উল্টো করে শুইয়ে রাখা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়—তাঁর হার্টবিট আর ওঠানামা নেই।

একই ঘরে থাকা দুই র‍্যাব সদস্য—নায়েক আরিফুল ও নায়েক এমাম হোসেনকেও দীর্ঘসময় ধরে পেটানো হয়। দুজনের মাথায় গভীর আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। একজনের মাথার পেছনের অংশ রক্তাক্ত। তাঁদের শরীরজুড়ে কপাল, হাঁটু, পিঠ ও হাতের জখম স্পষ্ট। হামলাকারীরা পুরো সময় গালাগাল করতে থাকে এবং মাঝে মাঝেই ‘আর কাউকে ছাড়বে না’ বলে চিৎকার করে। কয়েকজন ভিডিও ধারণ করে নিজেদের ফোনে সংরক্ষণও করে। হামলার শেষে কয়েকজন হামলাকারী নিজেরাই র‍্যাব সদস্যদের মাথায় ব্যান্ডেজ জড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

আরও দেখুন
পানি
সিলেট
Dhaka
রিপোর্ট

র‍্যাব–৭–এর একাধিক কর্মকর্তা জানান, দুই মাস ধরে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা ছিল। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ে। ঘটনার দিন সকালে র‍্যাবের একটি সোর্স খবর দেয়—এলাকায় একটি কার্যালয় উদ্বোধন হবে, যেখানে উপস্থিত থাকার কথা তিনজন আলোচিত সন্ত্রাসীর। তাদের একজন ইয়াছিন।

বিকেল তিনটার দিকে র‍্যাব–৭–এর ১৬ সদস্যের একটি দল এলাকায় পৌঁছায়। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে চার র‍্যাব সদস্য কার্যালয়ের ভেতরে ঢোকার পরপরই ইয়াছিনসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন ভেতরে ১৫০ জনের বেশি নেতাকর্মী ছিলেন। দুজনকে হাতকড়া পরানোর সঙ্গে-সঙ্গে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে ধাক্কাধাক্কি, পরে লাঠি–সোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে হামলা শুরু হয়। বাইরে থাকা র‍্যাব সদস্যরা ঢোকার চেষ্টা করলে মাইকে ঘোষণা দিয়ে আরও লোক ডেকে আনা হয়। মোট হামলাকারীর সংখ্যা তিন শতাধিক ছাড়িয়ে যায়।

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহিনুল ইসলাম বলেন, খবর পাওয়ার পর পুলিশ তিন কিলোমিটার দূরের নিজামপুর এলাকা থেকে চার র‍্যাব সদস্যকে উদ্ধার করে। তাঁদের শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল। গুলির কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।